আ’লীগ তৃণমূলের সম্মেলন জটে

129

বিএসএল বার্তা ডেস্কঃ আওয়ামী লীগের প্রায় পাঁচশ তৃণমূল কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। এসব কমিটির সম্মেলন জোরেশোরে শুরু করেও করোনাভাইরাসের প্রকোপের কারণে শেষ হয়নি। দীর্ঘদিন তৃণমূল কমিটিগুলোর সম্মেলন না হওয়ায় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। এর ফলে নেতৃত্বপ্রত্যাশীরা হতাশ হয়ে পড়ছেন। তৃণমূল নেতারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে দলের প্রায় সর্বত্র অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দল বাড়ছে।
ক্ষমতাসীন দলের ৭৮টি সাংগঠনিক জেলা কমিটির মধ্যে ৪৬টিই মেয়াদোত্তীর্ণ। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে তৃণমূল সম্মেলন শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৩২টি জেলা ও মহানগরের সম্মেলন হয়েছে। বাকি ৪৬ জেলার মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগেই।
একই সঙ্গে প্রায় সাড়ে ছয়শ উপজেলা, থানা ও পৌরসভা কমিটিরও দুই-তৃতীয়াংশেরই মেয়াদ পেরিয়ে গেছে অনেক আগে। কোথাও কোথাও ২০-২২ বছরেও সম্মেলন হয়নি। কয়েক হাজার ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও ইউনিট কমিটির মধ্যে ঠিক কতগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ, সেই পরিসংখ্যান দলের কাছেও নেই।
নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে দলের ২১তম জাতীয় সম্মেলনের আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ সব তৃণমূল কমিটির সম্মেলনের উদ্যোগ নিয়েছিল আওয়ামী লীগ। দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক চিঠিতে ২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে দলের সর্বস্তরের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সম্মেলন করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। পরে জেলা সম্মেলন জোরেশোরে শুরু হলেও জেলার অধীন শাখা কমিটিগুলোর সম্মেলন হয়নি। জাতীয় সম্মেলনের আগে-পরে ৩২টি জেলা এবং ১৩৮টির মতো উপজেলা, থানা ও পৌর কমিটির সম্মেলন হয়। শুধু বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় শতভাগ শাখা সম্মেলন হয়েছে।
করোনার থাবা :তৃণমূল সম্মেলন শুরুর পর ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে গত বছরের ৫ মার্চ পর্যন্ত ৩১টি জেলা সম্মেলন হয়। করোনার কারণে ৮ মার্চ থেকে তৃণমূল সম্মেলন বন্ধ হয়ে যায়। করোনা পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হওয়ার প্রেক্ষাপটে গত ১০ ডিসেম্বর জয়পুরহাট জেলার সম্মেলন হয়। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর আশঙ্কায় দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় তৃণমূল সম্মেলনসহ জনসমাগমের কর্মসূচি আপাতত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়।
বর্তমানে করোনার প্রকোপ কিছুটা কমায় ঝিমিয়ে পড়া সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও সম্মেলন কার্যক্রম আবারও শুরুর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন দলের নীতিনির্ধারক নেতারা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, করোনার সময় সাংগঠনিক কার্যক্রম সীমিত ছিল। বর্তমানে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার ও সাংগঠনিক সমস্যা নিরসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। সব পর্যায়ে সম্মেলনের মাধ্যমে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরুর নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
৪৬ জেলা কমিটির অবস্থা :মেয়াদোত্তীর্ণ ৪৬টি জেলার তিন বছরের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে এক থেকে পাঁচ বছর আগে। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল ২০০৬ সালের ২৬ জুন। পরে সম্মেলন ছাড়াই ২০১৩ সালের জুনে নতুন কমিটি গঠন করা হয়। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলায় সম্মেলন ছাড়াই কমিটি হয়েছিল ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে। এ দুই কমিটির মেয়াদ চার বছর আগে পার হয়েছে। সম্মেলন ছাড়াই গঠিত মাদারীপুর জেলা কমিটি ২০১৩ সালের ১২ নভেম্বর থেকে সাত বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছে। দ্বন্দ্ব-কোন্দলের কারণে এসব জেলায় সম্মেলন হচ্ছে না।
সিটি করপোরেশন গঠনের পর ২০১৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ মহানগর, ২০১৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি গাজীপুর মহানগর, ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর ময়মনসিংহ মহানগর এবং ২০১৭ সালের ২১ জুলাই কুমিল্লা মহানগর কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই চার সাংগঠনিক জেলা কমিটির মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেও সম্মেলন করা যায়নি।
এদিকে, ২০১২ সালের ১৫ নভেম্বর বরগুনা, ৮ ডিসেম্বর রাঙামাটি, ২৩ ডিসেম্বর দিনাজপুর এবং ২৭ ডিসেম্বর বরিশাল জেলার সম্মেলনে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ আট বছরের বেশি সময় পরও এই চারটি জেলায় সম্মেলন হয়নি। মেয়াদোত্তীর্ণ অন্য জেলাগুলোর মধ্যে সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছে ২০১৪ সালের ২১ জুন মুন্সীগঞ্জ, ২ ডিসেম্বর নাটোর, ২০ ডিসেম্বর পাবনা ও ঢাকা, ২৪ ডিসেম্বর নওগাঁ ও ৩০ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া; ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি পঞ্চগড়, ৮ জানুয়ারি সিরাজগঞ্জ, ১৪ জানুয়ারি নরসিংদী, ১৭ জানুয়ারি মানিকগঞ্জ, ২৭ জানুয়ারি চাঁদপুর, ২৮ ফেব্রুয়ারি মেহেরপুর, ৩ মার্চ লক্ষ্মীপুর, ৮ মার্চ মাগুরা, ২৫ মার্চ ঝিনাইদহ, ১৯ মে শেরপুর, ২০ মে জামালপুর, ১৮ অক্টোবর টাঙ্গাইল, ১১ নভেম্বর গোপালগঞ্জ, ১২ নভেম্বর রাজবাড়ী, ২ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গা ও ১১ ডিসেম্বর পিরোজপুর; ২০১৬ সালের ৩১ জানুয়ারি কক্সবাজার, ৬ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা দক্ষিণ, ১৯ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জ, ২০ ফেব্রুয়ারি ভোলা, ২৩ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোনা, ২৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জ, ২৭ ফেব্রুয়ারি শরীয়তপুর, ১২ মার্চ গাইবান্ধা, ২২ মার্চ ফরিদপুর, ২৯ এপ্রিল ময়মনসিংহ, ৯ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ ও ১৩ অক্টোবর গাজীপুর এবং ২০১৭ সালের ২৮ অক্টোবর মৌলভীবাজার। এসব জেলা কমিটির মেয়াদও এক থেকে পাঁচ বছর আগে শেষ হয়েছে।
গত এক বছরের মধ্যে যেসব জেলা সম্মেলন হয়েছে, তার বেশিরভাগেরই আবার পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা যায়নি। জেলা নেতাদের বিশেষ করে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের দ্বন্দ্ব-কোন্দলসহ নানা কারণে এখনও ১০টির মতো জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। কেন্দ্রের বারবার হুঁশিয়ারি ও কঠোর সতর্কবার্তা এবং কয়েকবার সময় বেঁধে দেওয়ার পরও এই দ্বন্দ্ব-কোন্দল নিরসন কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটিগুলো গঠন হয়নি। এই দ্বন্দ্ব-কোন্দলের কারণে গত মাসে সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদী জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
চার শতাধিক মেয়াদোত্তীর্ণ তৃণমূল কমিটি :আওয়ামী লীগের ৬৫০টি উপজেলা, থানা ও পৌরসভা কমিটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের বেশি কমিটি এখনও মেয়াদোত্তীর্ণ। কোথাও কোথাও ২০ থেকে ২৫ বছর আগে সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল। ১৫-২০টি উপজেলা ও থানায় কোনো কমিটিই নেই।
এই ৬৫০ কমিটির মধ্যে কমপক্ষে ৬২টির সম্মেলন হয়েছে ১৫ থেকে ২৫ বছর আগে। ছয় থেকে ১৪ বছর আগে সম্মেলন হয়েছিল অন্তত ১৬৫টি উপজেলা, থানা ও পৌরসভার। তিন বছরের বেশি ও পাঁচ বছরের মধ্যে সম্মেলন হয়েছে ২৫০-২৮৫টির।

কিশোরগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের মেয়াদ ২২ বছর আগে পার হয়েছে। সেখানে ২৫ বছর আগে ১৯৯৫ সালে সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে সর্বশেষ সম্মেলন হওয়া চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলা কমিটির মেয়াদ পার হয়েছে ২১ বছর আগে। ২৩ বছর আগে সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় ১৯৯৭ সালের ২ এপ্রিল ও কটিয়াদী উপজেলায় একই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর এবং পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলায় ১৯৯৭ সালে।
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল ১৭ বছর আগে ২০০৩ সালের ২১ নভেম্বর। ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার সম্মেলন হয় ১৬ বছর আগে ২০০৪ সালের ৫ নভেম্বর। মেহেরপুর পৌরসভায় ২০০৩ সালের ৭ আগস্ট, গাংনী উপজেলায় ২০০৪ সালের ১০ জানুয়ারি, ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলায় ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট এবং চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা, চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা ও দামুড়হুদা উপজেলায় ২০০৪ সালে সম্মেলন হয়।
নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় ২০০৩ সালে, পূর্বধলায় ২০০৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলায় ২০০৩ সালে, ঈশ্বরগঞ্জে ২০০৩ সালের ১৩ মার্চ, সদর উপজেলায় ২০০৩ সালের ৫ জুন, ফুলবাড়িয়ায় ২০০৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর, ভালুকায় ২০০৩ সালের ৩ ডিসেম্বর, নান্দাইলে ২০০৫ সালের ২৭ মে, সুনামগঞ্জ পৌরসভায় ২০০৩ সালের ১২ অক্টোবর, ছাতকে ২০০০ সালের ১ অক্টোবর, সিলেট সদর উপজেলায় ২০০৫ সালে, গোলাপগঞ্জে ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর এবং মৌলভীবাজার পৌরসভায় ২০০৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ সম্মেলন হয়।
আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয় চট্টগ্রামের ডবলমুরিংয়ে ২০০২ সালে, পাঁচলাইশে ২০০৬ সালে, খুলশীতে ২০০৪ সালে ও বাকলিয়ায় ১৯৯৮ সালে, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় ২০০০ সালের ১৮ আগস্ট, করিমগঞ্জে ২০০২ সালে, মিঠামইনে ২০০৫ সালের ২০ মার্চ, ইটনায় ২০০৫ সালের ২১ মার্চ, নিকলীতে ২০০৫ সালের ২৯ মার্চ ও অষ্টগ্রামে ২০০৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। নীলফামারীর জলঢাকায় ২০০৪ সালে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে ২০০৫ সালে, নাটোরের মান্দায় ২০০৫ সালের ১২ মে, পাবনার চাটমোহরে ২০০৩ সালের ৩০ জুলাই, চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলায় ২০০৩ সালে, হাইমচরে ২০০৩ সালের ১৮ জুলাই, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে ২০০৫ সালে, হাতিয়ায় ২০০৪ সালে, লক্ষ্মীপুর সদরে ২০০৩ সালের ১ আগস্ট, রায়পুরে ২০০৩ সালের ৩ আগস্ট এবং চট্টগ্রামের বন্দরে ৮ ডিসেম্বর ২০০৫ সালে সর্বশেষ কমিটি গঠিত হয়। দীর্ঘ দিনেও এসব উপজেলা ও পৌর কমিটির নতুন সম্মেলন হয়নি।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শেষ হওয়ার পর তৃণমূলের সম্মেলন কার্যক্রম আবারও শুরু করা হবে। সম্মেলনের মাধ্যমে সব জায়গায় নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি ও দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার উদ্যোগও নেওয়া হবে।