হ্যান্ডব্যাগের প্রচলন

52

বিএসএল বার্তা ডেস্কঃ শুধু প্রয়োজন নয়,নারীদের ফ্যাশনেরও অন্যতম অনুষঙ্গ হ্যান্ডব্যাগ। বর্তমানে ফ্যাশনেবল অনেক ব্যাগ ব্যবহার করা হলেও ইতিহাসে ব্যাগের গল্প ছিল কিছুটা আলাদা। প্রাচীন সময়ে বিভিন্ন প্রাণীর চামড়া দিয়ে বানানো ব্যাগের ব্যবহার ছিল বেশি। আবার ব্যাগের বদলে ব্যবহার হতো পোশাকের পকেট।

হ্যান্ডব্যাগের জন্ম

ব্যাগ কোনো নতুন উদ্ভাবন নয়। যখন থেকে মানুষ হাতে করে জিনিস বহন করছে, তখন থেকেই মূলত ব্যাগের প্রচলন শুরু হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ৩৮০০০ সালের শুরুর দিকে, শিকারিরা খাদ্য ও বিভিন্ন দরকারি সরঞ্জাম সংগ্রহের জন্য তন্তু দিয়ে পাউচ বানাতেন। প্রাচীন রোমের সময় থেকে শুরু করে রেনেসাঁ যুগ বা তারও পর পর্যন্ত এই পাউচগুলো নারী ও পুরুষ উভয়ই বেল্ট দিয়ে কোমরে বেঁধে রাখতেন। নারীরা বর্তমানে যে হাতব্যাগ ব্যবহার করেন, তার বিস্তার হয়েছে আরও বেশ কিছু সময় পরে। আর তখনই তৈরি হয়েছে ব্যাগের নতুন ইতিহাস।

ব্যাগের ব্যবহার গুরুত্ব পাওয়ার আগে নারীরা পোশাকে পকেট ব্যবহার করতেন। তবে এই পকেটগুলো পুরুষদের পোশাকে যে পকেট থাকে তার চেয়ে ভিন্ন ধরনের হতো। নারীদের পরিহিত স্কার্টের নিচে কোমরের দিকে আলাদা একটি কাপড় দিয়ে পকেট বানানো হতো। স্কার্ট যত বড় হতো, তত পকেটের সংখ্যা বাড়ত। ১৮ শতকের শেষের দিকে এই নকশায় বেশ খানিক পরিবর্তন আসে। তখন স্কার্টের বদলে লম্বা গাউনের প্রচলন শুরু হয়। নতুন ধরনের এই গাউনের ব্যবহার শুরু হওয়ার পর থেকে পকেটের সংখ্যাও কমে আসে। এ সময় অনেকগুলো পকেটের বদলে গাউনেই একটি বড় আকারের পকেট লাগানোর প্রচলন শুরু হয়। ১৭৯০ সালের দিকে এই পকেট যুক্ত হয় পোশাকের নিচে পরিহিত আঁটসাঁট ছোট পোশাকের সঙ্গে। আর ঠিক এ সময়েই নারীদের আগ্রহ পকেট থেকে সরে আসে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পকেটের প্রচলন এক রকম শেষ হয়ে যায়, জন্ম নেয় ব্যাগ। আধুনিক ব্যাগের আগে নারীরা যে ব্যাগ ব্যবহার করতেন, সেগুলো ছিল জালের তৈরি ছোট থলি। পকেট না থাকার কারণে এগুলোকে অপরিহার্য মানা হতো। এই থলি অবশ্য খুব বেশি বড় হতো না। নারীরা বাইরে যাওয়ার সময় অল্প সময়ে ব্যাগের ভেতর প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস যেমন পাউডার, হাতপাখা, পারফিউম, ভিজিটিং কার্ড ইত্যাদি উঠিয়ে নিতেন। অনেকেই এটিকে অপরিহার্য মানতে নারাজ থাকলেও কারও কারও জন্য এই ব্যাগ বেশ উপকারী ছিল।

বিরোধিতা

পকেটকে ব্যাগ হিসেবে ব্যবহার করার প্রচলন শুরু হলে কেউই সেটা নিয়ে তেমন মতবিরোধ করেননি। তবে পকেটগুলো নারীদের স্কার্টের নিচে থাকায় আর ত্বকের একদম কাছাকাছি থাকায় এগুলোকে অন্তর্বাস হিসেবেই মানা হতো। সব নারী এভাবে পকেট ব্যবহার করতে স্বস্তিও বোধ করতেন না। যার কারণে নারীদের মধ্যে ব্যাগের ব্যবহার বাড়তে থাকে। ব্যাগ বিখ্যাত হওয়া শুরু হলে এটিকে তখন অশ্লীল আর সমাজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রচার করা শুরু হয়। ব্রিটিশ হাউজ অব লর্ডসের ক্রস-বেঞ্চ মেম্বার ক্যারোলিন কক্স ব্যাগের ইতিহাস নিয়ে বলেছিলেন, ‘বর্তমানের এই হ্যান্ডব্যাগ অতীতে বেশ সাহসী ভূমিকা রেখেছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অন্তর্বাসকে বাইরের উপকরণে পরিণত করা। অনেকেই এটিকে অযৌক্তিক ভেবেছিলেন। একজন নারীর পোশাকের পকেটে তার ব্যক্তিগত জিনিস থাকবে এবং প্রয়োজনে জনসম্মুখে স্কার্টের নিচ থেকে সেই জিনিস তাকে বের করতে হবে এমন দৃশ্যই যেন তখন স্বাভাবিক ছিল। দৃশ্য বদলে ফেলার ঘটনাই তখন সমাজকে নাড়া দিয়েছিল।’

অবশ্য সে সময় শুধু পুরুষরাই নন, হ্যান্ডব্যাগের বিরোধিতা করেছিলেন বেশ কয়েকজন নারীবাদীও। এই নারীবাদীরা নারীদের পোশাকে পকেটের জন্য লড়াইও করেছিলেন। তাদের বিশ্বাস ছিল, হ্যান্ডব্যাগগুলো কখনোই পকেটের মতো ব্যবহারিক হবে না। বিরোধিতার আরও একটি কারণ ছিল, পকেটগুলো পুরুষদের পোশাকেও ছিল। তাদের মতে, পুরুষদের পোশাকে পকেট থাকবে আর নারীদের হাতে ব্যাগ, এটি দুই লিঙ্গের মধ্যে অসমতা তুলে ধরবে। নারীদের সম-অধিকার আদায়ের জন্য তখন তারা চেষ্টা করেছেন। নারীদের হ্যান্ডব্যাগ ব্যবহার তাদের পক্ষেই থাকুক অথবা বিপক্ষে, পোশাকে পকেট না থাকার অল্প সময়ের মধ্যে নারীদের প্রতিদিনের জীবনে ব্যাগ একটি অপরিহার্য বস্তু হয়ে ওঠে। যুগে যুগে চাহিদা ও পছন্দের পরিবর্তনের কারণে ব্যাগের আকার, আকৃতি ও নকশায় এসেছে নানা পরিবর্তন।

হ্যান্ডব্যাগের বিবর্তন

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সংখ্যা বাড়তে থাকে। নারীরাও ঘর ছেড়ে কেনাকাটার জন্য আগের চেয়ে বেশি বাইরে যাওয়া শুরু করে। অনেকক্ষণ সময় বাইরে থাকার জন্য নারীদের কাছে ব্যাগের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে। ছোট্ট ব্যাগে প্রয়োজন অনুযায়ী যতটুকু রাখা যেত, তার চেয়ে অতিরিক্ত বেশি জিনিস বহন শুরু হয়। ১৯ শতকের শেষের দিকে এবং ২০ শতকের শুরুর দিকে, এই জালের ছোট ব্যাগকে বদলে জায়গা করে নেয় হাতলওয়ালা লাগেজের মতো ছোট আকারের নতুন ব্যাগ। যুগান্তকারী এই পরিবর্তন নিয়ে আসে বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান লুই ভিটন। তাদের তৈরি করা ব্যাগগুলোর হাতলগুলো বেশ শক্ত হয়, ভেতরে অনেকগুলো কম্পার্টমেন্ট থাকে এবং বন্ধ করার জন্য থাকে একটি তালা। ব্যাগের নকশায় এমন পরিবর্তন নারীদের নিজস্ব জিনিসের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে। এর আগে নারীদের টাকা অথবা দরকারি জিনিস পুরুষরা নিজেদের পকেটে রাখতেন। সেই বিষয়টিতেও আমূল পরিবর্তন হয়। চমৎকারভাবে তৈরি হওয়া এই ব্যাগগুলো পুরুষদের ওপর নির্ভরশীলতা একদম কমিয়ে দেয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর, সমাজে নারীদের ভূমিকা দ্রুত পরিবর্তন হয়। এক কথায়, নারীদের স্বাধীনতা বাড়তে থাকে। সে সময় ভোট দেওয়ার অধিকারও অর্জন করে তারা। শতাব্দীর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ২০ শতকে বেশ সাহসী ভূমিকা রাখা শুরু করে। বাইরের প্রতিটি কাজেই তাদের সঙ্গী থাকে ব্যাগ।

সময়ের প্রতিচ্ছবি

যত সময় গড়াতে লাগল, ব্যাগ হয়ে উঠছিল নারীদের নিত্যদিনের ব্যবহার্য জরুরি অনুষঙ্গ এবং পরিণত হচ্ছিল সময়ের ব্যারোমিটারে। নারীদের চিন্তাচেতনা ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের প্রতিচ্ছবিও হয়ে ওঠে ব্যাগ। ব্যবসায়ীদের জন্য সাফল্যের ধারাবাহিকতা শুরু হয় ব্যাগ তৈরির মাধ্যমে। ১৯৩০ সালে জুয়েলাররা মিনেডিয়ার নামে ক্লাচের মতো ছোট এক ধরনের বক্স বানানো শুরু করেন। এগুলো বানানো হতো সোনা ও রুপার মতো বিলাসবহুল কিছু উপাদান দিয়ে। ৭০-এর দশকে নারীরা চকচকে এক ধরনের ধাতু দিয়ে ব্যাগ বানানো শুরু করেন, যেগুলো থেকে ডিসকো ড্যান্স ফ্লোরে আলো ছড়িয়ে পড়ত। ১৯৮০ সালের দিকে কেনাকাটার নতুন ঘরানার একটি সংস্কৃতি চালু হয়। সে সময় প্রচুর অর্থ আছে এমন ব্যক্তিরা নিজস্ব অর্থে বেশ বড় আকৃতির, ফ্ল্যাশি, বেশ জাঁকজমকময় ব্যাগ তৈরি করেন। হ্যান্ডব্যাগগুলো তখন হয়ে ওঠে পদমর্যাদার প্রতীক। অপেক্ষাকৃত ধনী নারীরা বেশ দামি দামি ব্যাগ ব্যবহার করতেন সে সময়।

১৯৪০ সালের দিকে, নারীদের ব্যাগগুলো ছিল বেশ সাধারণ আর ফাংশনাল। যুদ্ধসময়ের সীমিত জিনিস আর অবস্থার প্রকাশ ফুটে উঠত ব্যাগের ব্যবহারে। যুদ্ধের ময়দানে মিলিটারিরা যেমন কাঁধের এক পাশে ব্যাগ বহন করতেন, তেমন ব্যাগ নারীরা ব্যবহার করা শুরু করেন হাঁটাহাঁটি বা সাইকেল চালানোর সময়। এই ব্যাগ কাঁধে নিয়েই যুদ্ধের ময়দানে তারা সহায়তাও করেছেন। পরে এই ব্যাগগুলোকে নতুনভাবে আবারও নকশা করা হয় ৬০-এর দশকে। ব্যাগ যত জরুরি হয়ে উঠতে থাকে, ততই এগুলো আরও বেশি ফাংশনাল হয়ে উঠতে থাকে। বেশি জিনিস নেওয়ার জন্য ব্যাগের ভেতর অনেক কম্পার্টমেন্ট ব্যবহার করা হয়।

নারীরা যতই বাধা ভেঙে এবং সামাজিক চ্যালেঞ্জ মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে থাকেন, ততই যেন এ বিষয়টি ব্যাগের ওপর প্রতিফলন ফেলে। ১৯২০-এর দশকে তরুণীরা বিশেষ করে যারা তুলনামূলকভাবে কিছুটা ছোট পোশাক পরতেন এবং চুল ববকাট করতেন, তাদের মধ্যে চকচকে আর বেশ রঙিন ক্লাচের ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৬০ সালের দিকে ব্যাগের মধ্যে প্রাকৃতিক বিভিন্ন জিনিস দিয়ে কাজ করা হয়। শুরু হয়েছিল প্যাচআপ আর আর্টওয়ার্কের কাজ। এই ব্যাগগুলোর মাধ্যমে তখন সামাজিক পরিবর্তন বা বিদ্রোহ প্রকাশ পেত।

বিজ্ঞানীরা সিনথেটিক উপাদান নিয়ে যত গবেষণা করা শুরু করেন, আধুনিক হ্যান্ডব্যাগ বানানোর জন্য এই উপাদানগুলো তত বেশি ব্যবহার হওয়া শুরু হয়। ১৯৫০ সালের দিকে যখন প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়, তখন ট্রান্সপারেন্ট লুসাইট (এক্রেলিক রেজিন) নামে এক ধরনের হার্ড প্লাস্টিক দিয়ে বানানো ব্যাগ ব্যবহার করা শুরু হয়। এই ব্যাগটি দেখতে একদম ভিন্ন ধরনের ছিল। তবে এগুলো বিপজ্জনকও ছিল। কারণ এগুলোর তাপে গলে যাওয়া বা এগুলো থেকে টক্সিক গ্যাস বের হওয়ার মতো সমস্যা হতো। ৬০-এর দশকে বিখ্যাত ব্যাগগুলো বানানো হতো পিভিসি বা পলিইউরেথান নামে এক ধরনের উপাদান দিয়ে। এগুলো অবশ্য বেশ নিরাপদ ছিল। এরপর আসে অগ্নিপ্রতিরোধী লোম, অস্ত্র বানানোর নাইলন, নাইল ওয়েবিং (শক্ত ফ্যাব্রিক), ভেলক্রো (শক্ত হুক ও লুপ) এবং কেভলার (তাপ প্রতিরোধী শক্ত সিনথেটিক ফাইবার) দিয়ে বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা নারীদের হ্যান্ডব্যাগ বানানো।

সবচেয়ে পুরনো ব্যাগ

১৫০০ সালের দিকে ঐতিহাসিক যে ধরনের ব্যাগ ব্যবহার করা হতো সেগুলোর ধরন আবার একদম আলাদা ছিল। বর্তমানে তেমন ব্যাগের ব্যবহার নেই বললেই চলে। নেদারল্যান্ডসের টাসেন মিউজিয়ামে একটি ফ্রেঞ্চ পার্স রাখা আছে, যেটি বানানো হয়েছে ছাগলের চামড়া দিয়ে। পার্সের ভেতরে গোপন ১৮টি পকেট আছে। এ ধরনের ব্যাগগুলো দেখলে কারিগরদের সততা এবং জিনিস বানানোর প্রতি আগ্রহ ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ বোঝা যায়। ‘টাইরোলিয়ান আইসম্যান’ নামের ইতিহাসে এক ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়, যার কাছ থেকে মেলে প্রাচীন একটি ব্যাগ। তাকে এই নামটি দেওয়া হয়েছে তার সুরক্ষিত মমির কারণে। ধারণা করা হয় তিনি সম্ভবত ৩৪০০ থেকে ৩১০০ খ্রিস্টপূর্ব কোনো এক সময়ের মধ্যে বেঁচে ছিলেন। অস্ট্রিয়া ও ইতালির মধ্যবর্তী সিমিলন পর্বতের এক জায়গায় তার সন্ধান মেলে। তার কাছ থেকে যে ব্যাগটি পাওয়া যায় সেটির বয়স ৫০০০ বছরেরও বেশি।

মিসরীয় হায়ারোগ্রিফিকস লেখা এক ব্যাগের সন্ধানও পেয়েছেন প্রতœতাত্ত্বিকরা। এই পাউচগুলো ছিল বেশ ট্রেন্ডি ও স্টাইলিশ। চামড়ার তৈরি এই ব্যাগগুলো কাপড় বা অন্যান্য জিনিস বহনের জন্য ছিল না অবশ্য, এগুলো ব্যবহার করা হতো কয়েন রাখার জন্য।

১৪ ও ১৫ শতকের দিকে কয়েন রাখার জন্য পার্সের প্রচলন ব্যাপকভাবে শুরু হয়। এই পার্সগুলো অপরিহার্য ছিল, কারণ তখনো পোশাকে পকেটের ব্যবহার শুরু হয়নি। এই পার্সগুলো তখন কোমরের সঙ্গে বেল্ট দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। এই ঝোলানো ব্যাগগুলোয় থাকত দরকারি নানা জিনিস যেমন পবিত্র গ্রন্থ, জুয়েলারি, হাতে করা এমব্রয়ডারির জিনিস, বই অথবা চাবি। এ শতকে অবশ্য নারী ও পুরুষ উভয়ই কোমরে পাউচ বাঁধা শুরু করেন। ফ্যাশন জগতে এগুলো পরিচিত ছিল ‘হ্যামনডিস’ বা ‘টাসকুইস’ নামে। লম্বা ফিতা দিয়ে এই পাউচগুলো ঝোলানো থাকত। ফ্যাশন, স্ট্যাটাস, লাইফস্টাইলের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল এই পাউচ।