সিউলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে নানা আয়োজন

25

রক্তরঞ্জিত চিরচেনা একুশ এখন শুধু বাঙালি জাতিরই নয়, গোটা বিশ্ববাসীর সম্পদ, ঐতিহ্য ও গর্বের উৎস। একুশ জাতির জীবনে আত্মত্যাগ, শোকাবহ, গৌরবোজ্জ্বল, অহংকারে মহিমান্বিত চিরভাস্বর একটি দিন।

বেদনাদীর্ণ হৃদয় একুশে অম্লান চেতনাকে কোরিয়ার বুকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য প্রবাসীদের সঙ্গে নিয়ে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস। দিনভর আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতির অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজনের মধ্য মাতৃভাষা দিবস পালনের পাশাপাশি বীর শহীদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়।

রাজধানী সিউলের অদূরে আনসান শহরে অবস্থিত স্থায়ী শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন দেশটিতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম। শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে প্রথমে রাষ্ট্রদূত পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

শহীদ মিনারের সামনে ভাষাশহীদদের স্মরণে পালন করা হয় এক মিনিট নীরবতা। তার পরপরই দূতাবাসের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, ইপিএস ভিত্তিক কমিউনির সদস্যবৃন্দ ও কোরিয়ায় অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীরা শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

কনকনে শীত উপেক্ষা করে মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির প্রতি গভীর মমত্ববোধ ও ভালোবাসার টানে দূর-দুরান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন কোরিয়াস্থ প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এ সময় দূতাবাসের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। ‘অমর একুশে’ বইমেলার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বঙ্গবন্ধু প্যাভিলিয়নের উপর নির্মিত ভিডিও চিত্রটি প্রদর্শন করা হয়।

২১ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ করার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি,আমি কি ভুলিতে পারি’ উপস্থিত সবার মুখের গানের সুরে সুরে পতাকা উত্তোলন ও অর্ধনমিত করেন দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম।

অনুষ্ঠানের মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে প্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও সংস্কুতি প্রতিমন্ত্রীর বাণী পাঠ করে শোনানো হয়। ভাষা আন্দোলনের মহান শীদদের রূহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূতগণসহ জাতীয় কূটনৈতিক, দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব ও দূতালয় প্রধান স্যামুয়েল মুর্মু, দ্বিতীয় সচিব মিম্পে সোরেন, দূতাবাসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসাইনসহ সামাজিক ও রাজনৈকিত সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

অমর একুশের আলোচনার শুরুতেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ‘৭৫-এর কালরাতে শাহাদাত বরণকারী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যসহ সব শহীদের স্মরণ করেন রাষ্ট্রদূত।

তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর সদস্যদের মাতৃভাষার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষা প্রদানের অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরেন এবং এ বছরের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মূল প্রতিপাদ্য Language without borders’-এর আলোকে বিবাদ নিরসণে আন্তঃসীমানা ভাষার উপযোগিতার বিষয়ে তুলে ধরেন।

আলোচনায় রাষ্ট্রদূত বলেন, আজ এই দিনটি বাংলার মানুষের জন্য অত্যন্ত গৌরব ও স্মৃতিবিজড়িত দিন। ‘ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বাংলাদেশ এবং বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশিদের হৃদয়ে একটি বিষেশ স্থান করে আছে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল ঔপনিবেশিক প্রভুত্ব ও শাসন-পোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম প্রতিরোধ এবং জাতীয় চেতনার প্রথম উন্মেষ।

তিনি বলেন, আজ থেকে ৬৮ বছর আগে আজকের এই দিনে বাংলা মায়ের বীর সন্তানেরা মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার্থে বুকের রক্ত রঞ্জিত করেছিলেন ঢাকার রাজপথ। সেই সঙ্গে পৃথিবীর ইহিহাসে সৃষ্টি হয়েছিল মাতৃভাষার জন্য আত্মদানের অভূতপূর্ব নজির।

জাতিসংঘের ইউনেস্কো কর্তৃক ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করায় বাঙালি জাতির জন্য সুনিশ্চিতভাবেই এই দিনটি বাড়তি এক গর্ব বয়ে এনেছে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর বাঙালি জনগোষ্ঠী ভাষার জন্য এই আত্মত্যাগকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে ইউনেস্কো। বিশ্বে মানচিত্রে বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট আর্জন।

এ দিকে বিকালে বাংলাদেশ দূতাবাস ও কোরিয়ান ন্যাশনাল কমিশন ফর ইউনেস্কোর যৌথ উদ্যোগে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে ভাষার জন্য জীবন বিলিন করে দেয়া শহীদদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিকবৃন্দ, দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কেএনসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।

কেএনসিইউ-এর মহাসচিব মি. কোহাংহো কিম ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার ২১ বছরপূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানান এবং বহু সংস্কৃতিবাদের উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া প্রশান্ত বিষয়ক ব্যুরো-এর মহাপরিচালক মি. কিম জুং হান বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতির প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, বাংলাদেশের মাতৃভাষা রক্ষার্থে শহীদদের আত্মত্যাগ ও প্রচেষ্টার ইতিহাস তুলে ধরেন।

নিউজিল্যান্ড, কানাডা ও সিয়েরালিওনের রাষ্ট্রদূতগণ বহু ভাষাবাদের উন্নয়নে তাদের দেশ কর্তৃক গৃহীত কার্যক্রমের ওপর বিস্তারিত তুলে ধরেন।

নিউজিল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত এইচ ই মি. ফিলিপ টারনার বলেন, তার দেশ কয়েক দশকে অত্যন্ত বৈচত্র্যপূর্ণ একটি সমাজে পরিণত হয়েছে। সে কারণে ২০০-এর অধিক নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর দেশ নিউজিল্যান্ড তার আদিবাসীদের ভাষা রক্ষায় বদ্ধপরিকর।

বক্তব্যে কানাডার রাষ্ট্রদূত এইচ ই মি. মিসেল ডেনেগার বলেন, তার দেশে ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার পাশাপাশি ১৪০-এর অধিক প্রবাসী ভাষা ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আদি ভাষা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ক্রমেই হারিয়ে যাওয়া আদি ভাষা রক্ষার্থে তার সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছে।

ভাষা শহীদদের নিয়ে বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের অংশগ্রহণে দেশাত্মবোধক গান ও কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি মুগ্ধকর একটি পরিবেশ তৈরি করে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আংশগ্রহণ করে কয়েক দেশের শিল্পীগোষ্ঠীরা। তার মধ্যে ছিল কোরিয়ান শিল্পীদের নৃত্য ও ভারতের কত্থক নৃত্যশিল্পীদের পরিবেশনা।

অনুষ্ঠান শেষে আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দকে ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশি সু-স্বাদ খাবার পরিবেশন করা হয় এবং সবার হাতে দূতাবাসের পক্ষ থেকে একটি করে কোরিয়ান ও বাংলাভাষা সংবলিত উপহার তুলে দেয়া হয়।