ভোটের আগে ভোটে এগিয়ে থাকলেই মনোনয়ন নয়

167

স্থানীয় সরকার পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় তৃণমূলের নেতাদের ভোটের রায়ের ওপর এবার আস্থা রাখছেন না দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। এ কারণে তৃণমূলের ভোটে প্রথম হলেই মনোনয়ন মিলছে না।

আওয়ামী লীগ দলীয় সূত্রগুলো বলছে, প্রার্থী বাছাইয়ে তৃণমূলে ভোটগ্রহণে অর্থ লেনদেন, সংসদ সদস্য, মন্ত্রীদের অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নানা অভিযোগ কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে এসেছে। ফলে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায় তৃণমূলের ভোটের বিষয়টি নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছে।

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ২৫টি পৌরসভার নির্বাচন হবে আসছে ২৮ ডিসেম্বর। এর পরের ধাপে ৬১ পৌরসভায় আগামী ১৬ জানুয়ারি নির্বাচন হবে। তৃতীয় ধাপে ৬৪ পৌরসভা নির্বাচনের ভোট হবে ৩০ জানুয়ারি। পৌরসভার মেয়র পদের নির্বাচন দলীয় প্রতীকেই হচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রথম ধাপের দলীয় প্রার্থী আগেই চূড়ান্ত করেছে। আর গত শুক্রবার চূড়ান্ত করা হয়েছে দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী। এর মধ্যে অন্তত ১০টিতে তৃণমূলের ভোটে পিছিয়ে থাকা নেতারা দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি পৌরসভায় তৃণমূলে ভোটগ্রহণ ছাড়াই মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দপ্তরে পাঠানো হয়েছিল। আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের একাধিক নেতাই এমনটা জানিয়েছেন।

ওই নেতারা জানান, এবারের পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাদের ভোটে এগিয়ে ছিলেন এমন বেশ কয়েকজনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ড প্রার্থীদের ভাবমূর্তি, গ্রহণযোগ্যতা, দলের জন্য অবদান, স্থানীয় রাজনীতির সমীকরণ ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। ফলে তৃণমূলে আওয়ামী লীগ নেতাদের ভোটে পিছিয়ে থেকেও কয়েকজন দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। সর্বশেষ শুক্রবার ৬১ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী চূড়ান্ত করতে দলটির স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের সভায়ও তৃণমূলের ভোটে পিছিয়ে থাকা অন্তত ১০ জন মনোনয়ন পান।

পৌরসভায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ওয়ার্ডের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের ভোট নেওয়া হয়। তৃণমূলের নেতাদের সেই ভোটের ফলাফল সংশ্লিষ্ট জেলা, উপজেলা ও পৌরসভা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের স্বাক্ষরযুক্ত চিঠিতে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের কাছে পাঠানো হয়।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, তৃণমূলে ভোট হলো মনোনয়ন প্রক্রিয়ার একটি অংশ মাত্র। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের। বোর্ড যাঁকে যেখানে যোগ্য মনে করছে, তাঁকেই মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে। তৃণমূলের ভোটে প্রথম হলেই তিনি মনোনয়ন পেয়ে যাবেন বিষয়টি এমন আর নয়। মনোনয়নের ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রার্থীর যোগ্যতা, দলের জন্য ত্যাগ, জনপ্রিয়তা, স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব—নানা বিষয় দেখে আমরা মনোনয়ন দিয়ে থাকি।

তৃণমূলে অর্থের বিনিময়ে ভোট প্রভাবিত হওয়ার প্রসঙ্গে কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, এগুলো করে তো কোনো লাভ হচ্ছে না। শুধু ভোটে এগিয়ে থাকলেই তো আর আমরা মনোনয়ন দিচ্ছি না।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের আরেক সদস্য মুহাম্মদ ফারুক খান বলেন, আমরা প্রার্থীর নানা বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মনোনয়ন চূড়ান্ত করে থাকি। প্রার্থীর যোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা, দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে অবস্থান—এগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তৃণমূল থেকে যে নামগুলো আসে সেগুলোর বিষয়ে নানা মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি।

জানা যায়, সিরাজগঞ্জ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান মেয়র আব্দুর রউফ মুক্তা। তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাদের ভোটাভুটিতে তিনি পান ২০ ভোট। সেখানে আরেকজন মনোনয়নপ্রত্যাশী হেলাল উদ্দিন পেয়েছেন ৩৬ ভোট। সিরাজগঞ্জের বেলকুচি পৌরসভায় মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান মেয়র বেগম আশানুর বিশ্বাস। তৃণমূলের ভোটে তিনি পেয়েছেন ৩২ ভোট। সেখানে আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী সাজ্জাদুল হক ৩৬ ভোট পেয়ে প্রথম হয়েছিলেন। শুক্রবার ৬১ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া আরো বেশ কয়েকজন তৃণমূলের ভোটে পিছিয়ে ছিলেন।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চাকে আরো শক্তিশালী করতে বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তৃণমূলে ভোটগ্রহণের পদ্ধতি শুরু হয়। কিন্তু এখন স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই করতে গিয়ে নানা বিচ্যুতি তাঁদের নজরে আসছে। কোথাও অর্থ লেনদেন, কোথাও স্থানীয় সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীর অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আসছে। ফলে গত নির্বাচনে তৃণমূলে আওয়ামী লীগের নেতাদের রায়কে তাঁরা যতটা গুরুত্ব দিয়েছিলেন, এবার তা দিতে পারছেন না। নিজেদের কারণেই ভালো একটি পদ্ধতি নষ্ট হয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারের উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগ যে ভোটের পথ নিয়েছে, তাতে কোথাও কোথাও তৃণমূলের নেতাদের দুর্নীতিতে যুক্ত হওয়ার পথ খুলে গেছে। ফলে দলের নীতি নির্ধারকদের এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে হচ্ছে।